ইন্টেল-এএমডির প্রসেসর সংকট, পিসি ও সার্ভার বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা

মেমোরি চিপের নজিরবিহীন সংকটের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার কম্পিউটার ও সার্ভার নির্মাতাদের জন্য নতুন দুঃসংবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইন্টেল এবং এএমডির প্রসেসর বা সিপিইউ সরবরাহ ঘাটতি।

সম্প্রতি ইন্টেল ও এএমডি উভয় প্রতিষ্ঠানের তৈরি সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিটের (সিপিইউ) সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা প্রযুক্তি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।

এইচপি ও ডেলের মতো বাজারের শীর্ষ পিসি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মতে, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকেই চাহিদার তুলনায় প্রসেসর প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের একটি ব্যবধান তৈরি হতে শুরু করে। সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবস্থাপকরা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি কয়েক মাস আগের তুলনায় অনেক বেশি খারাপের দিকে মোড় নিয়েছে। এ সংকটের কারণে প্রসেসর পাওয়ার জন্য অপেক্ষার সময় যেমন রেড়েছে, তেমনি সার্ভার ও পিসি উভয় ক্ষেত্রেই দাম কয়েক দফা বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, সামনের মাসগুলোয় এ পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। চলতি বছরে এরই মধ্যে কয়েক দফায় প্রসেসরের দাম বাড়ানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রসেসরের দাম এখন পর্যন্ত গড়ে ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং কিছুক্ষেত্রে এ হার আরো অনেক বেশি। ইন্টেল ও এএমডি উভয় কোম্পানিই সম্প্রতি গ্রাহকদের জানিয়েছে, সব ধরনের সিপিইউর দাম বাড়ানো হচ্ছে। ইন্টেল মার্চ থেকে এবং এএমডি এপ্রিল থেকে বর্ধিত নতুন দাম কার্যকর করবে বলে জানা গেছে।

প্রসেসর হাতে পাওয়ার দীর্ঘ সময় বা লিড টাইম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। একজন সার্ভার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী জানিয়েছেন, আগে যেখানে একটি প্রসেসর পেতে এক-দুই সপ্তাহ সময় লাগত, এখন সে অপেক্ষার সময় বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৮-১২ সপ্তাহ।

গেমিং পিসি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মতে, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ ঘাটতি আরো চরম আকার ধারণ করতে পারে। ইন্টেল ও এএমডি বর্তমানে সার্ভার প্রসেসর তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে ব্যক্তিগত কম্পিউটারের (পিসি) জন্য প্রসেসর সরবরাহ কমে যাচ্ছে। পিসি নির্মাতারা চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) অনেক কম পরিমাণে প্রসেসর পাবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনকি বেশি অর্থ পরিশোধ করেও পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না, যা একে মেমোরি চিপ সংকটের মতোই গুরুতর করে তুলছে।

ইন্টেল জানিয়েছে, ক্রমাগত চাহিদা বৃদ্ধি, কাঁচামালের বাড়তি খরচ এবং বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণেই নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে এএমডির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কম্পিউটিংয়ের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদাই মেমোরি চিপ ও অন্যান্য সরঞ্জামের ঘাটতির মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমনকি গ্লাস ক্লথের মতো কিছু কম পরিচিত উপাদানের সরবরাহ সংকটও এখন অ্যাপলের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরবরাহ সংকটের ফলে প্রযুক্তি বাজারে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। এইচপি, ডেল ও আসুসের মতো বড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অনেক গ্রাহকই এখন ২০২৬ সালকে সামনে রেখে ব্রিটিশ চিপ ডিজাইন প্রতিষ্ঠান আর্মের আর্কিটেকচার ব্যবহার করে কম্পিউটার তৈরির দিকে বেশি ঝুঁকছেন। বিশেষ করে ইন্টেলের প্রসেসরের তীব্র সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন বিকল্প খুঁজছে।

বিশ্বের পাঁচ নম্বর পিসি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আসুসের সিস্টেম বিজনেস জেনারেল ম্যানেজার জো লিয়াও জানিয়েছেন, ইন্টেল ও এএমডি বর্তমানে উচ্চমানের বা হাই-এন্ড চিপ তৈরিতে বেশি মনোযোগ দেয়ায় মিড-রেঞ্জের এক্স-৮৬ প্রসেসরের বাজারে বড় ধরনের শূন্যতা

তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে আর্মভিত্তিক পণ্যের বাজার দ্রুত বড় হচ্ছে। আসুসের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বর্তমানে ৩০ শতাংশ এআই পিসি আর্মভিত্তিক প্রসেসরে চলছে, যা গত বছরের শেষে ছিল ২০ শতাংশ।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সাল পর্যন্ত পিসি বাজারের ৮৫ শতাংশ এবং সার্ভার বাজারের ৭৮ শতাংশই ছিল ইন্টেল ও এএমডির তৈরি এক্স-৮৬ আর্কিটেকচারের দখলে। কিন্তু বর্তমানে এনভিডিয়ার নতুন ‘ভেরা’ সার্ভার সিপিইউসহ অ্যাপল, মিডিয়াটেক এবং কোয়ালকমের মতো কোম্পানিগুলোও দ্রুত শক্তিশালী ও বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী আর্ম আর্কিটেকচারের দিকে ঝুঁকছে। এমনকি এতদিন কেবল লাইসেন্স ও ডিজাইন সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করলেও আর্ম এখন নিজেরাই সার্ভার সিপিইউ বাজারে এনে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামছে।

আরও